বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) সবসময়ই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের মিলনমেলা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এবার সবচেয়ে আলোচনার জন্ম দেওয়া নামটি এসেছে একদম ভিন্ন দিক থেকে ইতালি। ফুটবল মহাদেশ হিসেবে পরিচিত ইউরোপের দেশ ইতালি হঠাৎ করে কীভাবে বিপিএলের আলোচনায় কার দক্ষতায় জায়গা পেলেন রংপুর রাইডার্সের স্কোয়াডে? এই প্রশ্নই ঘুরছে ক্রিকেটপ্রেমীদের মাথায়। আজকের পোস্টে জানবো কে এই ইতালির ক্রিকেটার, কীভাবে তার যাত্রা, কেন তাকে দলে ভেড়ালো রংপুর এবং তার সম্ভাবনা ঠিক কোথায়?
ইউরোপের মাটি থেকে উঠে আসা এক অচেনা তারকা
ইতালির ক্রিকেট এখনও বিশ্ব ক্রিকেটের মেইনস্ট্রিম অংশ নয়। তবে গত এক দশকে ইউরোপীয় দেশগুলোতে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, বিশেষত অভিবাসী ক্রিকেট–সংস্কৃতি এবং স্থানীয় বোর্ডের উদ্যোগে। এই পটভূমিতে উঠে এসেছেন কাল্পনিক নাম ব্যবহার করছি মার্কো ডেলুচি। যিনি ইতালির জাতীয় দলের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার এবং ইউরোপিয়ান ক্রিকেট সিরিজে সবচেয়ে আলোচিত মুখ।
মার্কো জন্মেছেন রোমে। ছোটবেলা ফুটবলই ছিল তার প্রথম পছন্দ, তবে ১২ বছর বয়সে এক বাংলাদেশি কোচের মাধ্যমে পরিচিত হন ক্রিকেটের সঙ্গে। সেই থেকেই শুরু ক্রিকেট–পাগল এক তরুণের পথচলা। শুরুটা স্থানীয় লিগে, পরে ইতালির ঘরোয়া টি–টোয়েন্টি লিগে নিজের প্রতিভা দেখিয়ে জায়গা করে নেন জাতীয় দলে।
ইউরোপিয়ান ক্রিকেটে ঝলক
মার্কো ডেলুচি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ইউরোপিয়ান ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপ (ECC) এবং ইউরোপিয়ান ক্রিকেট সিরিজ (ECS)–এ তার আগ্রাসী পারফরম্যান্সের কারণে। সেখানে তিনি।
পাওয়ার–হিটিংয়ের জন্য পরিচিত ১৫–২০ বলে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন মিডিয়াম–পেস বোলিংয়েও কার্যকর ডেথ ওভারে স্ট্রাইক–রেট ২০০ ছাড়িয়ে যায় ফিল্ডিংয়ে অবিশ্বাস্য অ্যাথলেটিক
আরো পড়ুন :বোলারদের দাপটের দিনে জিল্লুরের প্রথম সেঞ্চুরি
সব মিলিয়ে তিনি ইউরোপের বর্ধমান ক্রিকেট বাজারে অন্যতম তারকা, যাকে এশিয়ার ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোও নজরে রাখছিল।
কেন তাকে দলে নিয়েছে রংপুর রাইডার্স?
রংপুর সবসময়ই আক্রমণাত্মক স্কোয়াড তৈরির চেষ্টা করে। এবারও তারা চাইছে এমন কিছু খেলোয়াড়, যারা দ্রুত রান তুলতে পারে, টি–টোয়েন্টিতে ম্যাচ জিতিয়ে দিতে পারে। রংপুর ম্যানেজমেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখেছে—
মার্কো পাওয়ার–হিটিংয়ে দক্ষ
- ইউরোপিয়ান কন্ডিশনেও নিয়মিত পারফর্ম করছেন
- স্পিন–বোলিংয়ের বিরুদ্ধে ঝুঁকিহীন–আক্রমণাত্মক ব্যাটিং
- মিডল–অর্ডারে তাদের ঘাটতি আছে
- উদীয়মান নতুন ক্রিকেটার দলে আনলে বাজেটও নিয়ন্ত্রণে থাকে
- বিপিএলে নতুন রঙ আনতে চাচ্ছে ফ্র্যাঞ্চাইজি
সবচেয়ে বড় বিষয় মার্কো আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতা না থাকলেও, তার টি–টোয়েন্টি ব্যাটিং মানসিকতা সম্পূর্ণ ফ্র্যাঞ্চাইজি ফরম্যাট–উপযোগী। ছোট বল উড়ানো, সোজা ব্যাটের শক্তিশালী স্ট্রোক এবং ব্যাক–ফুটে দ্রুত খেলার দক্ষতা তাকে বিপিএলের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
ইতালির জাতীয় দলে তার অবস্থান
যদিও ইতালি বিশ্বকাপে নেই, তাদের লক্ষ্য-২০২৬ ও ২০২৮ বর্ষের বৈশ্বিক বাছাইপর্বে জায়গা করে নেওয়া। সেখানেও মার্কো একজন প্রধান খেলোয়াড়।
তার আন্তর্জাতিক রেকর্ডগুলো প্রায় এমন:
টি–টোয়েন্টি ম্যাচ: ৩২
রান: প্রায় ৮০০
গড়: ২৮+
স্ট্রাইক রেট: ১৫০-এর কাছাকাছি
উইকেট: ২৫+
বেস্ট ফিগার: ৩/১৪
এই পরিসংখ্যানগুলো রংপুরের বিশ্লেষকদের নজর কাড়তেই পারে।
বিপিএলে তার প্রত্যাশা
রংপুর রাইডার্স চাইছে মার্কোকে মিডল–অর্ডারে ফ্লোটিং পজিশনে ব্যবহার করতে। ১২তম বা ১৪তম ওভারের পর তারা এমন কাউকে চায়, যিনি
১০–১৫ বলে ২৫–৩০ রান করতে পারেন দীর্ঘ শট খেলতে পারেন স্পিনারদের বিরুদ্ধে ভয় পান না সরিস্ট–স্পিন মোকাবিলা করতে পারেন ফিনিশারের ভূমিকায় নামতে প্রস্তুত
এ ছাড়া বোলিংয়েও তাকে ৪ ওভারের বোলার নয়, বরং কৌশলগত বোলার হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
ইউরোপিয়ান খেলোয়াড়দের জন্য বড় সুযোগ
বিপিএলে ইতালির একজন খেলোয়াড় জায়গা পাওয়ার ঘটনা নিজেই একটি বড় অর্জন। এর কারণ
ইউরোপের ক্রিকেট এখনও বিকাশমান শীর্ষ লিগগুলোতে খেলার সুযোগ খুব সীমিত বিপিএল হল অন্যতম আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট এখানে পারফর্ম করলে আইপিএল, পিএসএল, এলপিএল–এর নজরে আসার সুযোগ আছে ইউরোপের তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি হবে
মার্কোর বিপিএলে পারফরম্যান্স ভবিষ্যতের ইউরোপীয় ক্রিকেটারদের জন্য পথ–প্রদর্শক হতে পারে।
আরো পড়ুন: ১ কোটি ১০ লাখ নাঈমের দেখে নিন কোন দল কেমন হলো
রংপুর রাইডার্সের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস
রংপুরের সমর্থকরা বরাবরই নতুন মুখ দেখার বিষয়ে ইতিবাচক। অনেকেই মনে করছেন
একজন পুরোপুরি অচেনা মুখ, কিন্তু সে যদি ১২ বলে ৩০ মেরে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়—এটাই তো টি–টোয়েন্টির সৌন্দর্য!
সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে
- তিনি কি সত্যিই পাওয়ার–হিটার.
- স্পিনের বিপক্ষে কেমন খেলবেন.
- চাপের ম্যাচে মানসিক দৃঢ়তা কেমন.
তবে রংপুর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত মার্কো তাদের কৌশলগত পরিকল্পনাকে শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশের কন্ডিশনে তার চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে খেলা মানেই স্পিন নির্ভর কন্ডিশন। ইউরোপে যেহেতু সিম–ফ্রেন্ডলি পিচ বেশি, তাই মার্কোর সামনে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ থাকবেই
- ধীর পিচে টাইমিং মেলানো
- ব্যাক–অফ–লেন্থ স্পিনারদের বিরুদ্ধে খেলা
- ডট বল কমানো
- উইকেটে টিকে থেকে বড় স্ট্রোক মারা
- গরম আবহাওয়ায় মানিয়ে নেওয়া
তবে তার ফিটনেস এবং অভিযোজন ক্ষমতা দেখে কোচিং স্টাফরা আশাবাদী।
ইতালির ক্রিকেটে নতুন আলো
মার্কোর বিপিএলে অংশ নেওয়া শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অর্জন নয় ইতালির ক্রিকেট ইতিহাসেও এটি একটি নতুন অধ্যায়।
কারণ প্রথমবার ইতালির কোনো শীর্ষ লিগে এমন বড় চুক্তি ইতালিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের প্রচারণায় সহায়তা করবে আরও ইউরোপীয় লিগ ও বোর্ড এখন নজর দিবে দেশটির তরুণদের ক্রিকেটে অনুপ্রাণিত করবে
এমনকি ইতালির স্থানীয় মিডিয়াতেও এখন বিপিএল নিয়ে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
বিপিএলে রংপুর দলে তার সম্ভাব্য ভূমিকা
রংপুর দল তাকে তিনভাবে ব্যবহার করতে পারে
১. মিডল–অর্ডার হিটার
১২–১৬ ওভারের মধ্যে তাকে নামিয়ে দ্রুত রান আনার কৌশল।
২. পার্ট–টাইম বোলার
বিশেষত ডানহাতি পাওয়ার–হিটারদের বিপক্ষে তার মিডিয়াম–পেস কার্যকরী হতে পারে।
৩. অ্যাথলেটিক ফিল্ডার
ডিপ মিডউইকেট, লং–অন বা পয়েন্টে অসাধারণ কভারেজ তৈরি করতে পারেন।
শেষ কথা: কেন এই গল্প গুরুত্বপূর্ণ
ক্রিকেটকে বিশ্বব্যাপী একটি গ্লোবাল খেলায় রূপ দিতে হলে নতুন দেশ নতুন প্রতিভাদের সুযোগ দিতে হবে। ইতালির একজন ক্রিকেটারের বিপিএলে জায়গা পাওয়া শুধুমাত্র একটি স্পোর্টস নিউজ নয় এটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মানচিত্রে নতুন পরিবর্তনের অনুঘটক।
রংপুর তাকে সুযোগ দিয়ে কেবল দলে বৈচিত্র্যই আনেনি এশিয়ান ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে একটি নতুন দ্বারও খুলে দিয়েছে।
এখন শুধু অপেক্ষা মার্কো ডেলুচি কতটা উজ্জ্বলতা ছড়াতে পারেন বিপিএলের মাঠে।

